#ফোকলোর (Folklore)

যাঁরা মনে করেন ফোকলোর মানে রূপকথা বা গানবাজনা, তাঁদের ধারণা পাল্টে দেওয়ার সময় এসেছে। ফোকলোর হলো একটি জাতির শিকড় সন্ধানের বিজ্ঞান। একটি দেশ বা জাতি বিশ্বদরবারে কতটা উন্নত, তা নির্ভর করে তাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তির ওপর। আর সেই সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড নিয়ে যারা কাজ করে, তারাই হলো ফোকলোরের শিক্ষার্থী। লোকজ জ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে যারা সমাজকে এগিয়ে নেয়, তারাই ফোকলোরিস্ট।

ফোকলোর বিভাগটি কেমন? এখানে কেন পড়ব?

সহজ কথায় বলতে গেলে, ফোকলোর হলো মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সমকালীন সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ। স্কুল-কলেজে আমরা বাংলা বা সমাজবিজ্ঞান পড়লেও ‘ফোকলোর’ বিষয়টি অনেকের কাছে নতুন মনে হতে পারে। কিন্তু ফোকলোর মানেই হলো আমাদের শেকড়। এটি মূলত একটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি বা বহুমুখী বিষয়। সমাজতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং সাহিত্যের একটি অনন্য মিশ্রণ এই বিভাগ। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের পালস বুঝতে ফোকলোর পাঠের কোনো বিকল্প নেই।

#কি_কি_পড়ানো_হয়:

চার বছরের অনার্স কোর্সে এখানে গ্রাম্য গান বা লোকগাথা পড়ানো হয় না, বরং একজন শিক্ষার্থীকে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। এখানে পড়ানো হয়:

Applied Folklore & Fieldwork: সরাসরি মানুষের কাছে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের হাতে-কলমে শিক্ষা।

Cultural Studies & Heritage Management: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা ও ব্যবস্থাপনা।

Globalization & Folklore: বিশ্বায়নের যুগে আমাদের সংস্কৃতির বিবর্তন।

Anthropology, Sociology & Childlore: সমাজ ও শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝার দক্ষতা।

Ethnography & Research Methodology: উচ্চতর গবেষণার সকল কলাকৌশল।

এছাড়াও ফোকলোরের শিক্ষার্থীদের লোক-স্থাপত্য, লোক-চিকিৎসা,লোকগান/লোকছড়া(যেখানে শুধুমাত্র লোকগান/ছড়ার উৎস, বিকাশ ইত্যদি সম্পর্কে পড়ানো হয়)এবং লোক-ধর্ম সম্পর্কে পড়তে হয়, যা তাদের চিন্তাশক্তিকে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও প্রসারিত করে।

#চাকুরীর_বাজার:

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে ফোকলোরে পড়লে চাকরি কোথায়? উত্তর হলো—বিসিএস থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংস্থায় ফোকলোরিস্টদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বিসিএস ও সরকারি চাকরি: বিসিএস-এর সিলেবাসের একটি বড় অংশ (বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাধারণ জ্ঞান) ফোকলোরের শিক্ষার্থীদের জন্য একদম পানিভাতের মতো। ফলে বিসিএস প্রিলিমিনারি ও ভাইভায় তারা অন্যদের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকে।

এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা: UNESCO, UNICEF, BRAC এর মতো বড় বড় সংস্থায় যখন ‘কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘কালচারাল হেরিটেজ’ নিয়ে কাজ হয়, তখন ফোকলোরিস্টদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

গবেষণা ও একাডেমি: বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি এবং বিভিন্ন মিউজিয়ামে কিউরেটর বা গবেষক হিসেবে কাজের বিশাল সুযোগ রয়েছে।

মিডিয়া ও সাংবাদিকতা: আমাদের লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা টিভি চ্যানেল বা অনলাইন পোর্টালে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের চাহিদা তুঙ্গে।

শিক্ষকতা: কলেজ নিবন্ধন না থাকলেও হাইস্কুলের সমাজবিজ্ঞান, বাংলা শিক্ষক সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ তো থাকছেই।

এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, প্রাইমারি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ রয়েছে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ:

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্যতম প্রাণবন্ত বিভাগ হলো ফোকলোর বিভাগ।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক: এই বিভাগের প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। শিক্ষকরা এখানে বন্ধুর মতো গাইড করেন, যা পড়াশোনার চাপকে আনন্দে রূপান্তর করে।

গবেষণা ও ফিল্ডওয়ার্ক: বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ থেকে রয়েছে আকর্ষণীয় ‘ফিল্ডওয়ার্ক’। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি দেখার ও শেখার সুযোগ পায়, যা অন্য অনেক বিভাগে বিরল।

কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস: খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক কাজে ফোকলোর বিভাগ সবসময়ই অগ্রগামী। আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেমন মেধাবী, তেমনি সৃজনশীল কাজেও তারা অতুলনীয়।

পরিবেশ: আমাদের ক্লাসরুমগুলো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এবং পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত। সেমিনার লাইব্রেরিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি অসংখ্য দুর্লভ বইয়ের সংগ্রহ।

পরিশেষে বলতে গেলে, যদি নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন এবং নিজেকে একজন দক্ষ গবেষক বা সমাজ-বিশ্লেষক হিসেবে দেখতে চান, তবে ফোকলোর বিভাগ আপনার জন্য সেরা পছন্দ হতে পারে। এটি কেবল একটি বিভাগ নয়, এটি একটি পরিবার।

Shohanur Rhaman Showrov

সেশনঃ ২০২৪-২৫

ফোকলোর বিভাগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *